আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সা) এর প্রতি (দীনের অনুশাসনের) ঈমান আনার নির্দেশ এবং তার প্রতি মানুষকে আহ্বান করা, দীন সম্বন্ধে (জানার জন্য) প্রশ্ন করা ও তা সংরক্ষণ, আর যার কাছে দীন পৌঁছেনি তার কাছে দীনের দাওয়াত পেশ করা প্রসঙ্গেঃ

২৩) খালাফ ইবনে হিশাম ও ইয়াহইয়া ইবনে ইয়াহইয়া রহ… ইবনে আব্বাস রাযি. থেকে বর্ণনা করেন যে, আবদুল কায়সের গোত্রের) একটি প্রতিনিধি দল রাসূলুল্লাহ (সা) এর খিদমতে হাযির হয়ে আরয করল, হে আল্লাহর রাসূল! আমরা রাবী’আ গোত্রের লোক। আমাদেড় এবং আপনার মধ্যে কাফির মুযার গোত্র বিদ্যামান। আমরা শাহরুল হারাম ব্যতীত আপনার কাছে নিরাপদে পৌঁছাতে পারি না। কাজেই আপনি আমাদের এমন কিছু আদেশ দিন আমরা যে সবের উপর আমল করতে পারি এবং আমরা অন্যদের প্রতি আহ্বান জানাতে পারি। রাসূল (সা) বললেন, তোমাদের আমি চারটি বিষয় পালনের আদেশ করছি এবং চারটি বিষয়ে নিষেধ করছি। আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করা। অত:পর তাদেরকে এর ব্যাখ্যা দিলেন, বললেন, আল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহ্ নেই এবং মুহাম্মদ (সা) আল্লাহর রাসূল-এ কথার সাক্ষ্য দেওয়া, নামায কায়েম করা যাকাত দেওয়া এবং তোমাদের গনীমতলব্ধ সামগ্রীর এক-পঞ্চমাংশ আদায় করা। আর আমি তোমাদের নিষেধ করছি দুব্বা, হানতাম, নাকীর, মুকায়্যার থেকে। খালাফ তাঁর বর্ণনায় আরো উল্লোখ করেছেন, আল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহ নেই বলে রাসূলুল্লাহ (সা) একটি আঙুলি বন্ধ করেন।

একটি প্রশ্ন: হজ একটি ফরজ আমল ও ইসলামের পঞ্চম স্তম্ভের একটি হওয়া স্বত্ত্বেও কেন আলোচ্য হাদীসে এর উল্লেখ নেই।

উত্তর: (ক) হজ ফরজ হয়েছে নবম হিজরীতে। আর আবদুল কায়েস প্রতিনিধি দল দরবারে রেসালাতে আগমন করেছিলো ষষ্ট হিজরী সালে। তখনও হজ ফরজ হওয়ার হুকুম নাযিল হয় নি। তাই রাসূলুল্লাহ (সা) এ নির্দেশ তাদেরকে প্রদান করেন নি। (খ) আবদুল কায়েস প্রতিনিধিদের দরবারে রেসালাতে আগমনের পূর্বেও যদি হজ ফরজক হয়ে থাকে তাহলে এর বিভিন্ন করাণ থাকতে পারে। এক. হজ সমর্থবানদের উপর ফরজ, সবার উপরে নয়। দুই. হজ জীবনে একবার কারলেই ফরজ আদায় হয়ে যায়। অথচ উল্লিখিত অন্যান্য আমল গুলো সদা সর্বদা বা অন্তত বছরে একবার পালনীয়। তাই অপেক্ষাকৃত জরুরী এবং সেই মুহূর্তে না হলেই নয় এমন আমলগুলো কথাই শুধুই উল্লেখ করা হয়েছে। তিন. বাইতুল্লায় আসতে পথিমধ্যে তাদেরকে কাফের গোত্র মুজারের বসতি অতিক্রম করতে হতো। ফলে পথ নিরাপদ না হওয়ায় তাদের উপর তা ফরজ ছিলো না বিধায় রাসূলুল্লাহ (সা) হজের বিষয়টি উল্লেখ করেন নি।

২৪) আবূ বকর ইবনে আবূ শায়বা, মুহাম্মদ ইবনে মুসান্না এবং মুহাম্মদ ইবনে বাশ্শার রহ…আবূ জামারা রাযি. থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, আমি আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাযি-এর কথা লোকদের বোঝাবার দায়িত্ব পালন করতাম। একবার একজন স্ত্রীলোক তাঁর কাছে এসে কলসীর নাবীয সম্পর্কে জানতে চাইল। ইবনে আব্বাস রাযি. বললেন, আবদুল কায়স গোত্রের এক প্রতিনিধি দল রাসূলুল্লাহ (সা) এর কাছে হাযির হলে, তিনি জিজ্ঞেস করলেন, ‘প্রতিনিধি দলটি কারা? অথবা বললেন, ‘লোকগুলি কারা?’ তারা বলল, আমরা রাবী’আ গোত্রের লোক, রাসূলুল্লাহ (সা) তাদেও অভ্যর্থনা জানিয়ে বললেন, তোমরা অপমানিত ও লাঞ্চিত হওয়ার আগেই এসেছো বলে তোমাদের মোবারকবাদ। রাবী বলেন, তারা বলল, হে আল্লাহর রাসূল আমরা বহু দূরাঞ্চল থেকে আপনার খিদমতে হাযির হয়েছি। আমাদের ও আপনার মধ্যে রয়েছে মুযার গোত্রীয় কাফির সম্প্রদায়। তাই ‘শাহরুল হারাম ছাড়া আমারা আপনার কাছে পৌঁছতে অপারগ। সুতরাং আপনি আমাদেরাকে ইসলামের সুস্পষ্ট বিধান সম্পর্কে নির্দেশ দান করুন। যেন আমরা আমাদেও পশ্চাতের লোকজনকে তা অবহিত করতে পারি এবং তদনুযায়ী আমল করে আমরা জান্নাতে প্রবেশ করতে পারি। বর্ণনাকারী বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা) তখন তাদের চারটি বিষয় পালনের নির্দেশ দিলেন এবং চারটি বিষয় থেকে নিষেধ করলেন। এক আল্লাহর প্রতি ঈমান আনার নির্দেশ দিলেন এবং বললেন, তোমরা জান,এক আল্লাহর প্রতি ঈমান আনা কী? আরয বললেন, আল্লাহ ও তাঁর রাসূল এ বিষয়ে ভাল জানেন। রাসূলুল্লাহ (সা) বললেন, এ সাক্ষ্য দেওয়া যে, আল্লাহ ব্যতীত কোন ইলাহ্ নেই এবং মুহাম্মদ (সা) আল্লাহর রাসূল আর তোমরা তোমরা নামায কায়েম করবে, যাকাত দিবে, রমযানের রোযা পালন করবে এবং গনীমতলব্ধ সামগ্রীর এক-পঞ্চমাংশ দান করবে। তিনি তাদেও চারটি বিষয়ে বিরত থাকার নির্দেশ দেন। তা হচ্ছে দুব্বা, হানতাম, মুযাফফাত। চতুর্থটি সম্বন্ধে শু’ বা বলেন,এরপর রাবী কখনো ‘নাকীর’ কখনো বা ‘মুকায়্যাব’ শব্দ উল্লেখ করেছেন। রাসূল (সা) বললেন, এসব বিধান হিফাযত করবে এবং যারা আসেনি, তাদেও তা জানিয়ে দিবে।

২৫) উবায়দুল্লাহ ইবনে মু’ আয রহ…ইবনে আব্বাস রাযি. থেকে শু’ বার বর্ণনার অনুরূপ রিওয়ায়াত করেছেন। রাসূল (সা) বলেছেন: আমি তোমাদের দুববা, নাকীর, হানতাম ও মুযাফফাত নামক নাবীয তৈরির পাত্রের ব্যবহার নিষেধ করছি। ইবনে মু’ আয রহ. তাঁর পিতার সূত্রে বর্ণিত রিওয়ায়াতে আরো উল্লেখ করেন যে, ইবনে আব্বাস রাযি. বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা) আশাজ্জ অর্থাৎ আবদুল কায়েস গোত্রের ‘আশাজ্জ- কে বললেন, তোমার দু’ টি বিশেষ গুণ রয়েছে, যা আল্লাহ পছন্দ করেন, (তা হলো) সহিষ্ণূতা ও ধীর-স্থিরতা।

২৬) ইয়াহইয়া ইবনে আইয়্যূব রহ…আবূ সাঈদ খুদরী রাযি. থেকে বর্ণনা করেন যে, আবদুল কায়স গোত্রের কয়েকজন রাসূলুল্লাহ (সা) এর কাছে উপস্থিত হয়ে আরয করল, হে আল্লাহর নবী! আমরা রাবী’আ গোত্রের লোক। আপনার ও আমাদের মধ্যবর্তী যাতায়াত পথে মুযার গোত্রের কাফিররা অবস্থান করছে। শাহরুল হারাম ছাড়া আমরা আপনার কাছে আসতে পারি না। অতএব আপনি আমাদের এমন কাজের আদেশ দিন যা দ্বারা আমরা যারা আসেনি, তাদের জানতে পারি এবং যা পালন করে আমরা জান্নাতে প্রবেশ করতে পারি। রাসূলুল্লাহ (সা) বললেন, তোমাদের চারটি বিষয় পালনে এবং চারটি বিষয় থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দিচ্ছি। (পালনীয় চারটি বিষয় হলো): তোমরা আল্লাহরইবাদত করবে, তাঁর সাথে অন্য কাউকে শরীক করবে না, নামায কায়েম করবে, যাকাত দিবে, রমযানের রোযা পালন করবে এবং গনীমতের এক-পঞ্চমাংশ প্রদান করবে। আমি তোমাদেরকে চারটি বিষয়ে নিষেধ করছি: দুব্বা, হানতাম, মুযাফফাত ও নাকীর-এর ব্যবহার। তারা আরয করল হে আল্লাহর নবী! আপনি নাকীর সম্পর্কে কতটুকু জানেন? তিনি বললেন,এ হলো খেজুর বৃক্ষের মূল খোদাই করা তৈরি পাত্র। এতে কুতাইআ নামক খেজুর দিয়ে তাতে পানি ঢেলে রেখে দাও; অবশেষে যখন তার উথলানো থেকে যায় তখন তা পান করে থাকো। ফলে তোমাদের কেউ বা তাদের কেউ (নেশাগ্রস্ত হয়ে) আপন চাচাতো ভাইকে তলোয়ার দিয়ে আঘাত করে বসে। আবূ সাঈদ খুদরী রাযি. বলেন উপস্থিত লোকদের মধ্যে এভাবে আঘাতপ্রাপ্ত এক ব্যক্তি ছিলেন। তিনি বলেন, লজ্জায় আমি রাসূলুল্লাহ (সা) থেকে আঘাতটি গোপন করছিলাম। আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আমরা কিসে পান করব? রাসূল (সা) বললেন, রশি দ্বারা মুখবন্ধ চামড়ার পাত্রে। তারা আরয করল, হে আল্লাহর নবী! আমাদের দেশে ইঁদুরের উপদ্রব বেশি। সেখানে চামড়ার পাত্র অক্ষত রাখা যায় না। নবী (সা) বললেন, যদিও তা ইঁদুরে কেটে ফেলে, যদিও তা ইঁদুরে কেটে ফেলে, যদিও তা ইঁদুরে কেটে ফেলে। রাবী বলেন, নবী (সা) আবদুল কায়স গোত্রের আশাজ্জ সম্পর্কে বললেন, তোমার মধ্যে দু’টি বিশেষ গুণ রয়েছে যা আল্লাহ পছন্দ করেন (তা হলো) সহিষ্ণূতা ও ধীর-স্থিরতা।

২৭) মুহাম্মদ ইবনে মুসান্না ও ইবনে বাশশার রহ…আবূ সাঈদ খুদরি রাযি. থেকে বর্ণনা করেন, যখন আবদুল কায়েস গোত্রের প্রতিনিধিদল রাসূলুল্লাহ (সা) এর কাছে এলো । হাদীসটির বাকি অংশ ইবনে উলায়্যার বর্ণনার অনুরুপ। তবে এ বর্ণনায় রয়েছে তোমরা এর মধ্যে ‘কুতাইয়া’ বা তমার ও পানি ঢেলে দাও।

২৮) মুহাম্মদ ইবনে বাককার আল-বাসরী রহ…আবূ সাঈদ খুদরী রাযি, থেকে বর্ণনা করেন যে, আবদুল কায়স গোত্রের প্রতিনিধিদল নবী (সা) এর খিদমতে হাযির করল, হে আল্লাহর নবী! আল্লাহ আপনার জন্য আমাদের কুরবান করুন। আমাদের জন্য কোন ধরনের পাত্র ব্যবহারযোগ্য? নবী (সা) বললেন, তোমরা নাকীরে পান করবে না। তারা আরয করল, হে আল্লাহর নবী! আপনার জন্য আল্লাহ আমাদের কুরবান করুন। আপনি কি জানেন নাকীর কি? তিনি বললেন, হ্যাঁ। নাকীর এক ধরনের পাত্র যা খেজুরগাছের মূল খোদাই কওে তৈরি হয়। তিনি আরো বললেন, দুববা, হানতামেও তোমরা পান করবে না এবং তোমরা মুখবদ্ধ পাত্র ব্যবহার করবে।

(সহীহ মুসলিম-২৩-২৮)