আল হাদিস

শুরু করছি মহান আল্লাহ্‌র নামে যিনি পরম করুণাময়, অসীম দয়ালু

হাদিস (আরবি: الحديث‎‎) হলো মূলত ইসলামের সর্বশেষ বাণীবাহকের বাণী ও জীবনাদর্শ। হাদিসের উপদেশ মুসলমানদের জীবনাচরণ ও ব্যবহারবিধির অন্যতম পথনির্দেশ। আল কুরআন ইসলামের মৌলিক গ্রন্থ এবং হাদিসকে অনেক সময় তার ব্যাখ্যা হিসেবেও অভিহিত করা হয়ে থাকে। হাদিস বিষয়ে পণ্ডিত ব্যক্তিকে মুহাদ্দিস বলা হয়।

‘মুহাদ্দিস’ অর্থ বর্ণনাকারী বা বক্তা। হাদিসের পঠন-পাঠনকে যারা পেশা হিসেবে গ্রহণ করেন, তাদেরকে ‘মুহাদ্দিস’ বলা হয়। ‘মুহাদ্দিস’ কর্তাবাচক বিশেষ্য, এ শব্দের আদেশসূচক ক্রিয়া দ্বারা আল্লাহ নবিকে সম্বোধন করেছেন। বলা হয়েছে:

وَأَمَّا بِنِعۡمَةِ رَبِّكَ فَحَدِّثۡ

“আর আপনার রবের অনুগ্রহ আপনি বর্ণনা করুন”। [আদ-দুহা ৯৩:১১]

এর ব্যাখ্যা করা হয়, যে রিসালাত দিয়ে আপনাকে প্রেরণ করা হয়েছে তা পৌঁছে দিন, আর যে নবুওয়ত আপনাকে দেওয়া হয়েছে তা বর্ণনা করুন। নবি ‘মুহাদ্দিস’, কারণ তিনি কুরআন ও হাদিস বর্ণনা করে রিসালাত ও নবুওয়তের দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে শুধু হাদিস বর্ণনাকারীদের মুহাদ্দিস বলা হয়। এ পরিভাষা সাহাবিদের যুগেও ছিল।

হাদীস সংকলনের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস

সাহাবীগণ ইসলামের সর্বশেষ নবীর কথা ও কাজের বিবরণ অত্যন্ত আগ্রহ সহকারে স্মরণ রাখতেন। আবার কেউ কেউ তার অনুমতি সাপেক্ষে কিছু কিছু হাদীস লিখে রাখতেন। এভাবে তার জীবদ্দশায় স্মৃতিপটে মুখস্ত করে রাখার সাথে সাথে কিছু হাদীস লিখিত আকারে লিপিবদ্ধ ছিল। হযরত আলী, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস, হযরত আনাস ইবনে মালিক প্রমুখ সাহাবীগণ কিছু কিছু হাদীস লিপিবদ্ধ করে রাখতেন। হযরত আবূ হুরায়রা বলেন “আবদুল্লাহ ইবনে আমর ব্যতীত আর কোন সাহাবী আমার অপেক্ষা অধিক হাদীস জানতেন না। কারণ, তিনি হাদীস লিখে রাখতেন আর আমি লিখতাম না।” নবীর জীবনদ্দশায় ইসলামী রাষ্ট্রের প্রশাসনিক বহু কাজকর্ম লিখিতভাবে সম্পাদনা করা হতো। বিভিন্ন এলাকার শাসনকর্তা, সরকারী কর্মচারী এবং জনসাধারনের জন্য বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন বিষয়ে লিখিত নির্দেশ প্রদান করা হতো। তাছাড়া রোম, পারস্য প্রভৃতি প্রতিবেশী দেশসমূহের সম্রাটদের সাথে পত্র বিনিময়, ইসলামের দাওয়াত এবং বিভিন্ন গোত্র ও সম্প্রদায়ের সাথে চুক্তি ও সন্ধি লিখিতভাবে সম্পাদন করা হতো। আর ইসলামের নবীর আদেশক্রমে যা লেখা হতো তাও হাদীসের অন্তর্ভুক্ত। ইসলামের নবীর মৃত্যুর পর বিভিন্ন কারণে হাদীস সংকলনের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। কুরআন মাজীদের সাথে হাদীস সংমিশ্রণ হওয়ার আশংকায় কুরআন পুর্ণ গ্রন্থাকারে লিপিবদ্ধ না হওয়া পর্যন্ত হাদীস লিপিবদ্ধ করতে কেউ সাহস পায়নি। আবূ বকরের আমলে কুরআন মজীদ গ্রন্থাকারে লিপিবদ্ধ হলে সাহাবীগণ হাদীস লিপিবদ্ধ করার ব্যাপারে আর কোন বাধা আছে বলে অনুভব করেননি। হিজরী প্রথম শতাব্দীর শেষভাগে সাহাবি ও তাবেয়ীগণ প্রয়োজন অনুসারে কিছু হাদীস লিপিবদ্ধ করেন। অতঃপর উমাইয়া খলিফা উমর ইবনে আব্দুল আযীয হাদীস সংগ্রহের জন্য মদীনার শাসনকর্তা আবু বকর বিন হাজম সহ মুসলিমবিশ্বের বিভিন্ন এলাকার শাসনকর্তা ও আলিমগণের কাছে একটি ফরমান জারী করেন যে, আপনারা মহানবী হাদীসসমূহ সংগ্রহ করুন। কিন্তু সাবধান! মহানবী এর হাদীস ব্যতীত অন্য কিছু গ্রহণ করবেননা। আর আপনার নিজ নিজ এলাকায় মজলিস প্রতিষ্ঠা করে আনুষ্ঠানিকভাবে হাদীস শিক্ষা দিতে থাকুন। কেননা, জ্ঞান গোপন থাকলে তা একদিন বিলুপ্ত হয়ে যায়। এই আদেশ জারীর পর মক্কা, মদীনা, সিরিয়া, ইরাক এবং অন্যান্য অঞ্চলে হাদীস সংকলনের কাজ শুরু হয়। কথিত আছে যে, প্রখ্যাত মুহাদ্দিস ইমাম ইবনে শিহাব যুহরী সর্বপ্রথম হাদীস সংগ্রহ এবং সংকলনে হাত দেন। কিন্তু তার সংকলিত হাদীসগ্রন্থের সন্ধান পাওয়া যায়নি। এরপর ইমাম ইবনে জুরাইজ মক্কায়, ইমাম মালিক মদীনায়, আবদুল্লাহ ইবনে আব্দুল ওয়াহহাব মিসরে, আব্দুর রাজ্জাক ইয়েমেনে, আবদুল্লাহ ইবনে মুবারক খুরাসানে, এবং সূফিয়ান সাওরী ও হাম্মাদ ইবনে সালমা বসরায় হাদীস সংকলনে আত্ননিয়োগ করেন। এ যুগের ইমামগণ কেবল দৈনন্দিন জীবনে প্রয়োজনীয় হাদীসগুলো ও স্থানীয় হাদীস শিক্ষাকেন্দ্রে প্রাপ্ত হাদীসসমূহ লিপিবদ্ধ করেছিলেন। তাদের কেউই বিষয়বস্তু হিসেবে বিন্যাস করে হাদীসসমূহ লিপিবদ্ধ করেননি। এ যুগে লিখিত হাদীস গ্রন্থসমূহের মধ্যে ইমাম মালিকের “মুয়াত্তা” সর্বপ্রথম ও সর্বপ্রধান প্রামান্য হাদীসগ্রন্থ। ইমাম মালিকের “মুয়াত্তা” গ্রন্থটি হাদীস সংকলনের ব্যাপারে বিপুল-উৎসাহ উদ্দিপনার সৃষ্টি করেছিল। এটি হাদীসশাস্ত্র অধ্যায়নে মুসলিম মণিষীদের প্রধান আর্কষণে পরিণত হয়েছিল। এরই ফলশ্রূতিতে তৎকালীন মুসলিম বিশ্বে সর্বত্র হাদীস চর্চার কেন্দ্র কিতাবুল “উম্ম” এবং ইমাম আহমাদ বিন হাম্বলের “মাসনাদ” গ্রন্থদ্বয় হাদীসের উপর গুরুত্বপুর্ণ গ্রন্থ হিসেবে বিবেচিত। অতঃপর হিজরী তৃতীয় শতাব্দীতে অনেক মুসলিম মণিষী বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে প্রচুর হাদীস সংগ্রহ করেন। তন্মধ্যে বিখ্যাত হলেন ইমাম বুখারী, ইমাম মুসলিম, ইমাম আবূ দাউদ, ইমাম তিরমিজী, ইমাম নাসাঈ, এবং ইমাম ইবনে মাজাহ। এদের সংকলিত হাদীস গ্রন্থগুলো হলো সহীহ বুখারী, সহীহ মুসলিম, সুনানে আবূ দাউদ, জামি’ আত-তিরমিযী, সূনানে নাসাঈ এবং সূনানে ইবনে মাজাহ্। এই ছয়খানা হাদীসগ্রন্থকে সন্মিলিতভাবে সিহাহ সিত্তাহ বা ছয়টি বিশুদ্ধ হাদীসগ্রন্থ বলা হয়। আব্বাসিয় যুগে হাদীস লিপিবদ্ধের কাজ পরিসমাপ্ত হয়।

বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গিতে হাদিস সংকলন

আল্লামা সাখাবি বলেন-

আভিধানিক অর্থে হাদিস শব্দটি কাদিম তথা অবিনশ্বরের বিপরীত আর পরিভাষায় বলা হয় রাসূলুাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর দিকে সম্বন্ধযুক্ত। চাই তার বক্তব্য হোক বা কর্ম বা অনুমোদন অথবা গুণ এমন কী ঘুমন্ত অবস্থায় বা জাগ্রত অবস্থায় তাঁর গতি ও স্থির সবই হাদিস।
বুখারী শরিফের বিশিষ্ট ব্যাখ্যাগ্রন্থ عمدة القارى এর মধ্যে হাদিস সম্বন্ধে রয়েছে: ইলমে হাদিস এমন বিশেষ জ্ঞান যার সাহায্যে প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কথা, কাজ ও অবস্থা জানতে পারা যায়।
আর ফিক্হবিদদের নিকট হাদিস হলো আল্লাহর রাসূলের কথা ও কাজসমূহ।
মুফতি সাইয়্যেদ মুহাম্মাদ আমীমুল ইহসান বারকাতী এর মতে, হাদিস (حديث) এমন একটি বিষয় যা রাসূলুাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর বাণী, কর্ম ও নীরবতা এবং সাহাবায়ে কেরাম, তাবিঈনদের কথা, কর্ম ও মৌন সম্মতিকে বুঝায়।

তথ্যসূত্রঃ

১।   মিশকাতুল মাসাবীহ (দাখিল টেক্সবুক হাদীস শরীফ, বাংলাদেশ মাদরাসা শিক্ষা বোর্ড)
২।   তারিখে ইলমে হাদীস, মুফতী সাইয়্যেদ মুহাম্মাদ আমীমুল ইহসান বারকাতী।
৩।   হাদীসে আরবাঈন, চলি­শ হাদীস , সংকলন: মুফতী সাইয়্যেদ মুহাম্মাদ আমীমুল ইহসান বারকাতী, অনুবাদ ও ব্যাখ্যা মাওলানা সাইয়্যেদ মুহাম্মাদ সাফওয়ান নোমানী, সাইয়্যেদ মুহাম্মাদ নাঈমুল ইহসান বারকাতী।